পাবনায় চলছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বিক্রির রমরমা সিন্ডিকেট: হোতা জামায়াত নেতা!
পাবনার ঈশ্বরদীতে সরকারি নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের দখল কেনাবেচার বাণিজ্য। গৃহহীন ও ভূমিহীন পরিবারের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে নির্মিত ঘর হস্তান্তরের কোনো বৈধ সুযোগ না থাকলেও স্থানীয় প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেটের সহায়তায় স্ট্যাম্পে সই নিয়ে চলছে কেনাবেচা। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় এক জামায়াত নেতার ইশারায় দীর্ঘদিন ধরে এই বাণিজ্য চালিয়ে আসছে তারা।
উপজেলার মুলাডুলি ইউনিয়নের বহরপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পে সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য। অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রকল্পের ২০৮টি বাড়ির মধ্যে অর্ধেকের বেশি মূল বরাদ্দপ্রাপ্তরা এখন আর সেখানে বসবাস করেন না। গৃহহীনদের জন্য বরাদ্দকৃত এসব ঘর ৪০-৮০ হাজার টাকায় হাতবদল হয়েছে। এমনকি একই ঘর একাধিকবার বিক্রি ও ভাড়া দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আশ্রয়ণ প্রকল্পের একাধিক বাসিন্দা জানান, স্ট্যাম্পের মাধ্যমে শতাধিক বাড়ি হস্তান্তরিত হয়েছে, আর প্রতিটি ঘর বিক্রির টাকার সিংহভাগই হাতিয়ে নিচ্ছে ওই প্রভাবশালী সিন্ডিকেট।
তাদের অভিযোগ, উপজেলা জামায়াতের আইন বিষয়ক সম্পাদক হাফিজুর রহমান হাফিজ মেম্বারের ইশারায় এসব লেনদেন পরিচালনা করছেন আশ্রয়ণ প্রকল্পের তথাকথিত সাবেক সভাপতি শফিকুল ইসলাম, বর্তমান সভাপতি রাজীব হোসেন এবং মহিলা নেত্রী পাপিয়া সুলতানা ওরফে পলি।
অনিক হোসেন নামে এক ব্যক্তি জানান, বাসিন্দা আকলিমা খাতুনের মৃত্যুর পর কথিত ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি ঘরটি কিনে নেন এবং জমির দলিলও বুঝে পান।
আরেক ক্রেতা চায়না বেগম জানান, তার নিকটাত্মীয় তরিকুল ইসলামের ঘর কিনে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাস করছেন তিনি, যার জন্য তাকে গুনতে হয়েছে ৪০ হাজার টাকা।
এছাড়া নূর ইসলাম নামে আরেক ব্যক্তি ৬০ হাজার টাকায় কিনেছেন জান্নাত আরা নামে এক বাসিন্দার ঘর। শুধু আকলিমা, তরিকুল বা জান্নাতই নন, প্রকল্পের শতাধিক ঘর বিক্রি হয়েছে ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে, যার মাত্র ১০-২০ শতাংশ অর্থ পেয়েছেন প্রকৃত মালিকরা, বাকিটা চলে গেছে সিন্ডিকেটের পকেটে।
পরিচয় গোপন রেখে কথা হয় তথাকথিত সিন্ডিকেটের নারী নেত্রী পাপিয়া সুলতানা পলির সঙ্গে। তিনি জানান, বরাদ্দপ্রাপ্তদের কাছ থেকে একাই তিনটি ঘর কিনেছেন তিনি। প্রতিবেদক আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর কিনতে আগ্রহ দেখালে ৫০-৬০ হাজার টাকায় একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দেওয়ারও আশ্বাস দেন তিনি। তার দাবি, এভাবে প্রায় শতাধিক ঘর তারা বিভিন্নজনকে বন্দোবস্ত করে দিয়েছেন, কোথাও কোনো সমস্যা হয়নি।
একইভাবে সিন্ডিকেটের আরেক সদস্য রাজীব হোসেনও ঘর হাতবদলের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, ঝর্ণা, আঞ্জুয়ারা, রুমা, মরজিনা, জাহিদা ও সাথী আক্তারসহ আরও ১০-১৫ জন বাসিন্দা এরই মধ্যে তাদের ঘর ছেড়ে চলে গেছেন এবং ঘরগুলো বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। চাইলে সেখান থেকে একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন তিনি, বিনিময়ে দিতে হবে ৫০ হাজার টাকা।
তবে ঘর বেচাকেনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত জামায়াত নেতা হাফিজ মেম্বার। তার ভাষ্য, একাধিক নয়, প্রকল্পের একটি ঘর ফাঁকা থাকার খবর পেয়ে স্থানীয় টুটুল নামে এক ব্যক্তিকে সেই ঘরের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন তিনি, তবে এতে কোনো আর্থিক লেনদেন হয়নি। তার দাবি, কথিত ওই সিন্ডিকেট তার নাম ভাঙিয়ে অনৈতিক সুবিধা নিয়েছে, তবে এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।
এদিকে আশ্রয়ণ প্রকল্পে বর্তমানে বসবাসরত বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, পয়ঃনিষ্কাশন ও পানি নিষ্কাশনের উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় রাস্তায় কাদাপানি জমে থাকে, যা চলাচলে চরম ভোগান্তির কারণ। কর্মসংস্থানের অভাবে অনেকেই এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। প্রভাবশালীদের প্রশ্রয়ে প্রকল্প এলাকায় মাদকাসক্তদের উৎপাত, মাদক ব্যবসা ও দেহব্যবসার মতো অপকর্ম সংঘটিত হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে, ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের বসবাস হয়ে পড়েছে অনিরাপদ।
ঈশ্বরদী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সেহাব উদ্দিন সরকার জানান, আশ্রয়ণ প্রকল্পে অধিকাংশ প্রকৃত বাসিন্দা না থাকায় ঘরগুলো ঠিকমতো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে না এবং কিছু জায়গায় কাদাপানি জমে আছে। এসব সংস্কারের বিষয়ে দ্রুতই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জানতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাসান মোহাম্মদ শোয়াইবের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসাদুজ্জামান সরকার অনিয়মের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমরাও অবগত হয়েছি। যারা নীতি লঙ্ঘন করে ঘরের দখল বিক্রি করেছেন, তাদের তালিকা তৈরি করে ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসক বরাবর পাঠানো হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ায় দলিল বাতিল সম্পন্ন হলে ঘরগুলোর বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যেসব ক্রেতা হাতবদল করে এসব ঘর নিয়েছেন তাদের অধিকাংশই ভূমিহীন, তাই মানবিক দিক বিবেচনা করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে যারা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অনৈতিক লেনদেনের সঙ্গে জড়িত, তদন্ত করে অচিরেই তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সর্বাধিক পঠিত
কম্বল দেয়ার কথা বলে বাড়িতে ডেকে বিধবাকে ধর্ষণ জামায়াত সমর্থকের
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে কম্বল দেওয়ার কথা বলে বাড়িতে ডেকে এক বিধবাকে (৪৭) ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে কাউছার (৪০) নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। তিনি জামায়াতের সমর্থক বলে এলাকায় পরিচিত। গত রোববার …
খুঁটিতে বেঁধে কুপিয়ে তরুণের হাত-পা প্রায় বিচ্ছিন্ন, জামায়াতের ২ কর্মী গ্রেপ্তার
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায় আবু সুফিয়ান (২২) নামের এক তরুণকে বিদ্যুতের খুঁটিতে বেঁধে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়েছে। এতে ওই তরুণের দুই হাত ও এক পা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে …
জামায়াত কখনো ভারতবিরোধী ছিল না: আমির
বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী কখনও ‘ভারতবিরোধী ছিল না’ উল্লেখ করে দলটির আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘এটি অপপ্রচার’। তিনি বলেন, ‘জামায়াতকে ভুলভাবে উপস্থাপন করতে সুচিন্তিতভাবে, মিথ্যা ও অপপ্রচার করা হয়েছে।’ …
বারবার ফ্যাসিস্ট বলা পছন্দ করি না, আমি মৌলবাদী না: জামায়াত আমির
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমরা ইউনাইটেড বাংলাদেশ গড়তে চাই। আমি বারবার ফ্যাসিজম আর ফ্যাসিস্ট বলা পছন্দ করি না। কারণ এরাও তো আমাদের পরিবারের সদস্য, রাজনৈতিক …
বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩ কোটি টাকা আত্মসাতে জামায়াত নেতারা
আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) স্থায়ী তহবিল থেকে অন্তত ৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে জামায়াতে ইসলামীর চার নেতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। আইআইইউসি পরিচালনায় সরকার গঠিত …
কারাবন্দি জামায়াত নেতার বউ নিয়ে শিবির নেতা উধাও
ফেনীতে অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামী কারাবন্দি জামায়াত নেতা কামাল হোসেন প্রকাশ লতা কামালের স্ত্রী (২৭) পরকিয়া করে এক শিবির নেতার সাথে উধাও হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ঘটনাটি …
মসজিদে তাবলিগ জামাত নিষিদ্ধ ও প্রাণনাশের হুমকি দিলেন জামায়াত নেতা
সিলেট নগরীর দাড়িয়াপাড়াস্থ শাহ গওহর রহ. মসজিদে যুগ যুগ ধরে চলে আসা দাওয়াত ও তাবলিগের কার্যক্রমকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে জামায়াত নেতা রাজিক মিয়ার নেতৃত্ব। রাজিক মিয়া দীর্ঘদিন ধরে …
জামায়াত আমিরের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে কাজের মেয়েকে ধর্ষণের মামলা
প্রফেসর ড. মাহমুদুল হাসান, জামাত আমিরের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা! কিন্তু তার রয়েছে নি’কৃ’ষ্ট এক অতীত ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত একটা খবরে জানা যায়, স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে …